মুক্তিযুদ্ধে ব্রাহ্মণবাড়িয়া এক অম্লান ইতিহাস সৃষ্টিকারী জেলা

644
মুক্তিযুদ্ধে ব্রাহ্মণবাড়িয়া brahmanbaria-liberation-war
মুক্তিযুদ্ধে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ভূমিকা

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ব্রাহ্মণবাড়িয়া একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পরিণত হয়েছিল। এর প্রধান কারণ ছিল এই জেলার ভৌগলিক অবস্থান। এখান থেকে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার সাথে ছিল সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা। ত্রিপুরা থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে গেরিলা বাহিনী ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উপর দিয়ে এই দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করত। শুধু তাই নয়, মুক্তিযুদ্ধের পুরো নয় মাসই এই জেলার বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত হয়েছে সম্মুখ যুদ্ধ। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৫ সহস্রাধিক মুক্তিযোদ্ধা, ট্রেনিং নিয়ে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সান্ধ্য আইন জারি করা হয় এবং এদিনই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জনগণ সান্ধ্য আইন ভঙ্গ করে মিছিল বের করেন। ২৭ মার্চ সকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নিয়োজিত চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অফিসার কর্নেল শাফায়াত জামিল বীর বিক্রম তার সাথের বাঙালি সেনাদের নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া আর্মি ক্যাম্পের সকল পাকিস্তানি অফিসার ও সৈন্যকে বন্দি করেন। ঐদিন দুপুরে মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ বীর উত্তম মৌলভীবাজারের শমসেরনগর হতে তার সেনাদল নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আসেন এবং কর্নেল শাফায়াত জামিল তার কাছে চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কোম্পানির দায়িত্ব অর্পণ করেন।

মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য সমগ্র বাংলাদেশকে মোট ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়েছিল। প্রতিটি সেক্টরকে আবার কয়েকটি সাব সেক্টরে বিভক্ত করা হয়েছিল। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বে কসবার গঙ্গাসাগর ও আখাউড়া থেকে পশ্চিমের ভৈরব বাজার রেল লাইন পর্যন্ত ছিল ২নং এবং পূর্বে সিঙ্গারবিল থেকে উত্তরে হবিগঞ্জ পর্যন্ত ছিল ৩নং সেক্টরের অন্তর্ভূক্ত। ২নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর খালেদ মোশাররফ (পরে মেজর জেনারেল, বীর উত্তম, ১৯৭৫ সালের সামরিক অভ্যূত্থানে নিহত হন)। তিনি তাঁর সেক্টরকে ৬টি সাব-সেক্টরে ভাগ করেছিলেন।

এর মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়াস্থ কসবা-আখাউড়া গঙ্গাসাগরের সাব সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন ক্যাপ্টেন মো: আইন উদ্দিন (পরে মেজর জেনারেল অব. বীর প্রতিক, পিএসসি হয়)। তার সঙ্গে ছিলেন ক্যাপ্টেন মাহবুব, লেফটেন্যান্ট ফারুক ও লেফটেন্যান্ট হুমায়ূন কবির। এই এলাকায় চতুর্থ বেঙ্গলের একটি দল ছিলো। তারা সাব সেক্টর কসবা, আখাউড়া, সাইদাবাদ, নবীনগর, বাঞ্ছারামপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং কুমিল্লা মুরাদনগর পর্যন্ত অপারেশন চালাতো।

মন্দভাগ সাব সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন ক্যাপ্টেন এইচ এম এ গাফফার (পরে লেঃ কর্ণেল অব. বীর উত্তম হয়) তার অধীনে চতুর্থ বেঙ্গলের সি বা চার্লি কোম্পানি এবং মর্টারের একটি দল ছিল। এই সাব সেক্টর বাহিনী কসবা থানার মন্দভাগ রেল স্টেশন থেকে কুটি পর্যন্ত অপারেশন চালাতো। এছাড়া সালদা নদী-কোনাবন সাব সেক্টর কমান্ডার হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। এই সাব সেক্টরে একটি মর্টার প্লাটুনের কমান্ডার ছিলেন সুবেদার মঈন (বীর উত্তম), যিনি সালদা নদী-মন্দভাগ এলাকার যুদ্ধে শহীদ হন। তিনি ছিলেন ব্যাটালিয়ান কমান্ডার এবং সাব- সেক্টর কমান্ডার। তাঁর কমান্ডে সৈন্যসংখ্যা ছিল প্রায় চৌদ্দশ। এর মধ্যে আটশর মতো ব্যাটালিয়ান সৈন্য আর প্রায় ছয়শ সৈনিক ছিল সাব সেক্টর ট্রুপসে। বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইপিআর, পুলিশ এং যুদ্ধকালীন সময় প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তোলা সৈনিকরা ছিল ব্যাটালিয়ানের অন্তর্ভুক্ত। আর সেক্টর ট্রুপসে ছিল ছাত্র-যুবক ও কৃষকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের মুক্তিযোদ্ধা।

ক্যাপ্টেন গাফফারের এই ব্যাটালিয়ানে চারটা কোম্পানি ছিল। এর মধ্যে এ বা আলফা কোম্পানির কমান্ডার ছিলেন সুবেদার গোলাম আম্বিয়া। বি বা ব্রাভো কোম্পানির কমান্ডার ছিলেন সুবেদার ফরিদ, সি বা চার্লি কোম্পানির কমান্ডার ছিলেন সুবেদার আব্দুল ওহাব (বীরবিক্রম) এবং ডি বা ডেল্টা কোম্পানির কমান্ডার ছিলেন সুবেদার তাহের। ব্যাটালিয়ানের সেকেন্ড ইন কমান্ড ছিলেন লেফটেন্যান্ট কবির (পরে ক্যাপ্টেন কবির)। এই ব্যাটালিয়ানে দুটো মর্টার প্লাটুন ছিল। এর একটির কমান্ডার ছিলেন সুবেদার জব্বার এবং অন্যটির কমান্ডার ছিলেন সুবেদার মঈন (বীরউত্তম)। যুদ্ধ পরিচালনা করতে গিয়ে বাস্তব ক্ষেত্রে অনেক সময় এক সেক্টরের বাহিনী অন্য সেক্টরেও যুদ্ধ করেছে। ২নং সেক্টরের অধীনে প্রায় পঁয়ত্রিশ হাজার গেরিলা এবং ছয় হাজার নিয়মিত বাহিনীর সদস্য ছিল। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন এলাকায় গেরিলা অপারেশন চালিয়ে তারা হানাদার বাহিনীকে সব সময়ই সন্ত্রস্ত রেখেছিল।

১৯৭১ সালের ১৫ এপ্রিল আশুগঞ্জের লালপুরে ও ভৈরবে মুক্তিকামী বাঙ্গালী সামরিক অফিসার, জওয়ান ও মুক্তিযোদ্ধাগণ পাকিস্তানী ট্যাংক, নৌবহর, জঙ্গী বিমান, হেলিকপটারের ছত্রছায়ায় পরিচালিত আগ্রাসী বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রচণ্ড যুদ্ধে লিপ্ত হয়। মেঘনা নদীতে সংঘটিত এ যুদ্ধ ছিল মুক্তিসংগ্রামের প্রথম প্রস্তুতিমূলক লড়াই।

১৭ এপ্রিল আখাউড়া উপজেলার দরুইন গ্রামে প্রতিরক্ষা ঘাটি দখলদার বাহিনী আক্রমণ করে। চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ২ নং প্লাটুন কমান্ডার সিপাহী বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল অসম সাহসিকতা ও নির্ভীক চিত্তে প্রাণপণ যুদ্ধ করেন। ১৮ এপ্রিল শত্রুর ক্রমাগত আক্রমণ মোকাবেলা করতে গিয়ে তিনি শহীদ হন। তার বীরত্ব ও আত্মত্যাগের স্বীকৃতি স্বরূপ তাকে ‌বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবে ভূষিত করা হয়। দরুইন গ্রামে তার সমাধি অবস্থিত।

২২ মে মুজাহিদ ক্যাপ্টেন আবদুল হকের নেতৃত্বে একটি গেরিলা দল কসবা থানার সালদা নদী এলাকায় অবস্থারনত পাক বাহিনীর প্রতিরক্ষা ঘাটির উপর আকস্মিক আক্রমণ চালায়। গেরিলা দলটি হঠাৎ আক্রমনের পরপরই দ্রুত অবস্থান ত্যাগ করে। এ আক্রমনের ফলে পাক বাহিনীর প্রায় ১৫ জন হতাহত হয়। তাদের মধ্যে চারজন মারা যায়।

২৫ মে সালদা নদী এলাকায় মুক্তিবাহিনীর অতর্কিত হামলায় পাক সেনাদের একজন জেসিও এবং পাচজন সৈনিক নিহত হয়। ২৭মে একই এলাকায় সকাল ৭টায় মুক্তিবাহিনীর এ্যামবুশে পড়ে পাকবাহিনীর ৯ জন সৈন্য নিহত হয় । তাদের দুটি গাড়ি ধ্বংস হয়ে যায়। ৪ জুন রাতে চতুর্থ বেঙ্গলের দুটি প্লাটুন মর্টার ও মেশিন গান নিয়ে পাক বাহিনীর মোগড়া বাজার ঘাটিকে সামনে রেখে গোপনে অবস্থান নেয়। পরদিন ভোর বেলা চতুর্থ বেঙ্গলের সৈনিকরা মর্টার ও মেশিনগানের সাহায্যে আক্রমণ চালায়। অতর্কিত এ আক্রমণে পাকসেনারা হতভম্ব হয়ে যায়।এ আক্রমণে শত্রুদের প্রায় ১৭ জন নিহত এবং পাচজন আহত হয়। চতুর্থ বেঙ্গলের একজন সৈনিক গুরুতর আহত হন। দ্বিতীয় দফা আক্রমণে পাক বাহিনীর আরও পাচজন নিহত হয়। মুক্তিবাহিনী এরপর অবস্থান ত্যাগ করে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যায়।

১৪ সেপ্টেম্বর রাতে দুজন অফিসারসহ পাকবাহিনীর প্রায় এক কোম্পানি সৈনিক রেলযোগে আখাউড়া থেকে মুকুন্দপুর হয়ে হরষপুরের দিকে অগ্রসর হয়। এ সংবাদ জানতে পেরে তিন নং সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার লে: হেলাল মোরশেদ তার কজেকজন সঙ্গীসহ মুকুন্দপুর ও হরষপুরের মাঝামাঝি রেল লাইনে ট্যাংক বিধ্বংসী মাইন বসিয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন। রাত প্রায় চারটার দিকে পাকবাহিনী বোঝাই রেলগাড়িটি মাইনের আত্ততায় এসে যায়। সঙ্গে সঙ্গে বিকট শব্দে ইঞ্জিনসহ রেল গাড়ির কয়েকটি বগি লাইনচ্যুত হয়ে খাদে পড়ে যায়। দুজন অফিসারসহ ২৭জন পাকিস্তানি সৈনিক নিহত হয়। লে: হেলাল মোরশেদ তার বাহিনী নিয়ে নিরাপদে ক্যাম্পে চলে যান।

৭ অক্টোবর সালদা নদী স্টেশনে পাকিস্তান বাহিনীর সুদৃঢ় ঘাটি আক্রমণ করেন লেঃ গাফফার (পরবর্তীতে লেঃ কর্ণেল বীর উত্তম) দুটি স্তরে বিভক্ত পরিকল্পনা করে তিনি ৪টি সৈন্যদল নিয়ে রাতে আক্রমণ চালান। ৮ অক্টোবর ভোর বেলা শুরু হয় মূল আক্রমণ। মুক্তিবাহিনী ও বাঙ্গালী সৈনিকদের সমন্বয় ত্রিমুখী আক্রমণে বেলা ১১ টায় সালদা নদী স্টেশন মুক্ত হয়।

সালদা নদী, কোনাবন, মন্দভাগ সংলগ্ন এলাকায় নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ৪১ জন বীর মুক্তিযোদ্ধার সমাধী রয়েছে কোল্লা পাথর টিলার চূড়ায়। ১৯ নভেম্বর মুকুন্দপর সীমান্ত ফাড়িঁ আক্রমণ করে মুক্তিবাহিনী দখল করে নেয়। এ যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর ৩১ জন বন্দী হয়। হস্তগত হয় ২৭ টি রাইফেল, ২টি স্টেনগান, ২টি এলএমজি এবং ১X৩ ইঞ্চি মর্টার। ১-৩ ডিসেম্বর আখাউড়ায় মুক্তিবাহিনী আক্রমণ করে।

মুক্তিবাহিনী পাকিস্তানীদের অব্যাহত বিমান আক্রমণ এবং প্রায় বিরামহীন গোলন্দাজ ও স্বয়ংক্রীয় গুলিবর্ষণের বিরুদ্ধে ঘোরতর যুদ্ধ করে আজমপুর মুক্ত করে। ৪ ডিসেম্বর ভারতীয় সেনাবাহিনী বাংলাদেশে প্রবেশ করে। বাংলাদেশ এস ফোর্স এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৫৭ তম মাউন্টেন ডিভিশন আখাউড়া ঘিরে ফেলে। ৫ ডিসেম্বর আখাউড়ার পতন হয়। ৮ ডিসেম্বর ভারতীয় মাউন্টেন ডিভিশন ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌছে। পাকিস্তান বাহিনী এর আগেই ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছেড়ে চলে যায়। ৯ ডিসেম্বর আশুগঞ্জ আক্রমণ করা হয় এবং দখলদার বাহিনীর সাথে মিত্র বাহিনীর ব্যাপক যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ১০ ডিসেম্বর পাকিস্তান বাহিনী ভৈরবে পলায়ন করে। ১৯৭১ সালের ৮ ডিসেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়া হানাদার মুক্ত হয়।

বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল ১৯৭১ সালের ১৮ এপ্রিল আখাউড়ার দরুইন নামক এক গ্রামে শহীদ হন এবং তাকে সেখানেই সমাহিত করা হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মুক্তিযুদ্ধে আবদুল কুদ্দুস মাখনের অবিস্মরণীয় অবদানে, তাকে এক অনন্য পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল। আবদুল কুদ্দুস মাখন ছাড়াও অসংখ্য, অগণিত নাম না জানা মুক্তিযোদ্ধার আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা আজকের ব্রাহ্মণবাড়িয়া পেয়েছি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা উপজেলায় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণে গড়ে তোলা হয়েছে কুল্লাপাথর শহীদ স্মৃতিসৌধ। এখানে ৫০ জন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার কবর রয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নয় মাসের ইতিহাস অদম্য সাহস, অপরিসীম ত্যাগ ও সাফল্যের বীরত্বগাথাঁয় খচিত অম্লান এক ইতিহাস।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here