নবীনগর উপজেলার দর্শনীয় স্থান সমূহ

1247
নবীনগর উপজেলার দর্শনীয় স্থান সমূহ
মূল ছবিঃ Kamruz Zaman Niloy

নবীনগর উপজেলা

নবীনগর উপজেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার একটি প্রশাসনিক উপজেলা। নবীনগর উপজেলা আয়তনের দিক দিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী উপজেলা। এই উপজেলার মোট আয়তন ৩৫০.৩৩ বর্গ কিলোমিটার। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রাচীন এই জনপদ নবীনগরকে ইংরেজ শাসনামলে ভারত বর্ষের প্রথম ম্যাপ রোনাল্ড রে প্রণীত মানচিত্রে খুবই গুরুত্বের সাথে দেখানো হয়েছে, যেটা এই উপজেলার প্রাচীনত্বের প্রমাণ করে। ১টি পৌরসভা ও ২১টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই নবীনগর উপজেলার উত্তরে আশুগঞ্জ; পূর্বে সদর; দক্ষিণ-পূর্বে কসবা; দক্ষিণে কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর; পশ্চিমে বাঞ্ছারামপুর এবং উত্তর-পশ্চিমে নরসিংদী সদর ও রায়পুরা উপজেলা অবস্থিত।

ব্রিটিশ আমলে ১৮৭৫ সালে নবীনগর থানা প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল এবং ১৮৮৩ সালে নবীনগরে মুন্সেফ আদালত চালু করা হয়েছিল। সর্বশেষ ১৯৮৩ সালের ২৪ই মার্চ নবীনগর থানাকে আনুষ্ঠানিকভাবে উপজেলায় উন্নীত করা হয়। নবীনগরের নামকরণ নিয়ে দুই ধরনের জনশ্রুতি রয়েছে। প্রথম জনশ্রুতি অনুসারে, প্রাচীনকালের জনৈক নবীন চন্দ্র নামক রাজার নামানুসারে নবীনগর নামকরণ করা হয় কিন্তু বাস্তবে এই এলাকার প্রাচীন ইতিহাস অনুসারে এই নামে কোনো রাজা কিংবা জমিদারের সন্ধান পাওয়া যায়নি। দ্বিতীয় জনশ্রুতি অনুসারে, মুসলিম শাসনামলে ঈদে মিলাদুন্নবীর দিন নবী এবং নগর দুটি শব্দের সংমিশ্রনে নবীনগর নামকরণ করা হয় এবং এই জনশ্রুতির স্বপক্ষে সত্যতা পাওয়া যায়।

নবীনগর উপজেলার দর্শনীয় স্থান সমূহ

কাইতলা জমিদার বাড়ি

প্রায় দুইশত বছরের পুরাতন ঐতিহ্যবাহী কাইতলা জমিদার বাড়ি টি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার নূরনগর এলাকায় অবস্থিত। এই জমিদার বাড়িটিকে বর্তমানে অনেকে বড় বাড়ি নামে ডাকে। এই জমিদার বাড়িটি তৎকালীন ত্রিপুরার রাজা বিরেন্দ্র কিশোর মানিক্যের নিয়ন্ত্রণে ছিল। আর কাইতলার জমিদারের নাম ছিল বিশ্বনাথ রায় চৌধুরী, যিনি কলকাতা থেকে এখানে এসে বসতি নির্মাণ করেছিল। বর্তমানে এই কাইতলা জমিদার বাড়িটি পরিচর্যা ও সংরক্ষণের অভাবে ধ্বংসপ্রায় অবস্থায়। বর্তমানে এই জমিদার বাড়িটি ঘিরে তিনটি ভগ্ন, শ্যাওলা ঢাকা প্রাসাদ, একটি দিঘী ও আন্ধা পুকুর নামে একটি জলাশয় রয়েছে। ইতিহাসের ঐতিহাসিক নিদর্শনের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই জমিদার বাড়িটি। কাইতলা জমিদার বাড়িটি দেখার জন্য অগণিত ভ্রমনপ্রিয় মানুষ ভিড় করে নবীনগরের নূরনগরে।

রাধিকা-নবীনগর তিতাস নদীর ব্রীজ

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার প্রভাবশালী ব্রীজ গুলোর মাঝে রাধিকা-নবীনগর মহাসড়কের তিতাস নদীর ব্রীজটি অন্যতম। ব্রীজটিকে নবীনগরের সাথে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের সংযোগসেতু বলা হয়। ব্রীজটির মাঝ দিয়ে চলে গেছে বহুলপরিচিত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার চিরচেনা ঐতিহ্য তিতাস নদী। এছাড়াও ব্রীজটির পূর্ব পাড়ে রয়েছে বারো আওলিয়া বা দরবেশের নামে সুপরিচিত ‘বার আউলিয়ার বিল’ এবং তার পশ্চিম পাড়ে রয়েছে সূর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর জন্ম ভূমি শীবপুর গ্রাম। পড়ন্ত বিকেল বেলায় এই ব্রীজে প্রচুর জনসমাগমের দেখা মিলে।

বিদ্যাকুট সতীদাহ মন্দির

যারা ইতিহাসের জ্ঞান রাখেন, তারা অবশ্যই সতীদাহ প্রথা সম্পর্কে অবগত আছেন। হিন্দুধর্ম অনুসারে তৎকালীন কোনো স্ত্রীর স্বামী মারা গেলে স্বামীর সাথে সাথে স্ত্রীকেও জীবিত পুড়িয়ে ফেলা হত। অনেকক্ষেত্রে স্ত্রীর সম্মতিতে আবার অনেকক্ষেত্রে জোরপূর্বক পুড়িয়ে ফেলা হত। পুড়িয়ে ফেলার সময় জীবিত স্ত্রীর চিৎকার যাতে না শোনা যায়, সেই জন্য উচ্চস্বরে ঢাকঢোল ও বাদ্য যন্ত্র বাজানো হত। তৎকালীন হিন্দু সমাজের এই অমানবিক, বর্বর ও পৈশাচিক প্রথাকেই মূলত সতীদাহ প্রথা বলা হত।

এই সতীদাহ প্রথা ১৮২৯ সনে লর্ড উইলিয়াম বেনটিংক আইন করে পুরো ভারতবর্ষে বন্ধ করে দেন। এই বীভৎস প্রথার সর্বশেষ নিদর্শন খুঁজে পাবেন নবীনগর উপজেলার ইতিহাস প্রসিদ্ধ বিদ্যাকুট গ্রামে। এই গ্রামে দুই শত বছরের পুরাতন জীর্ণ একটি মন্দির রয়েছে। যার নাম সতীদাহ মন্দির অর্থাৎ এই মন্দিরে জীবিত স্ত্রীদের মৃত স্বামীদের সাথে পুড়িয়ে মারা হত। এই মন্দিরটি নির্মান করেছিলেন বিদ্যাকুটের প্রসিদ্ধ হিন্দু দেওয়ান বাড়ির লোক দেওয়ান রাম মানক। জনশ্রতি আছে, এই মন্দিরে সর্বশেষ ১৮৩৫ সনে রাম মানকের মাতাকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। এই বর্বর প্রথার সর্বশেষ নিদর্শন দেখতে পারেন নবীনগরের এই বিদ্যাকুট সতীদাহ মন্দিরে।

সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর নিজ হাতে তৈরী মসজিদ

সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ ভারত উপমহাদেশের সঙ্গীত অঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি জন্মগ্রহন করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার শিবপুর গ্রামে। ১৯৩৫ সালে তিনি বিশ্ব ভ্রমণে বের হন এবং ঐ সময় ইংল্যান্ডের রানী কর্তৃক সুরসম্রাট খেতাবপ্রাপ্ত হন আর ব্রিটিশ সরকার তাকে ‘খাঁ সাহেব’ উপাধিতে সম্মানিত করেন। এছাড়াও ভারতের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় খেতাব পদ্মভূষণ, পদ্মবিভূষণ, বিশ্ব ভারতীয় দেশীকোত্তমসহ দিল্লি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লাভ করেন সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি। তাঁর জীবদ্দশায় তিনি অসংখ্য প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করে গেছেন, এরমাঝে তাঁর আলোচিত কীর্তি হচ্ছে তাঁর নিজ হাতে বানানো মসজিদ।

এই মসজিদটি তিনি নির্মাণ করেন তারই জন্মভূমি শিবপুরে। ১৯১৯ সালে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ এই বিখ্যাত মসজিদটি নির্মাণ করেন, এর ছোট-বড় ১৬টি মিনার রয়েছে। এটি বিখ্যাত হওয়ার কারন হচ্ছে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ নিজ হাতে মাটি কেটে ফেলে ইট বসিয়ে মসজিদটি তৈরির সূচনা করেছিলেন। সুর সম্রাটের শতবছরের পুরাতন এই মসজিদের পাশেই তাঁর মা-বাবার কবর রয়েছে এবং মসজিদের পেছনে ঈদের নামাজের জন্য বড় একটি পাকা মাঠ রয়েছে এবং এর পাশেই একটি বিশাল পুকুর রয়েছে। সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর স্মৃতি বিজড়িত এই মসজিদটি ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছে নবীনগরে, যেটা ইতিহাস অনুসন্ধানী পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র হতে পারে।

এমপি টিলা

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার ধরাভাঙ্গা গ্রামে অবস্থিত এই এমপি টিলা। এমপি টিলা নাম হওয়ার বিশেষ একটা কারন রয়েছে। এই জায়গাটি প্রথমে বালুচর ছিল। তারপর সাবেক কেবিনেট সচিব ছিদ্দিকুর রহমান পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিকট উক্ত জায়গাটি সম্পর্কে প্রস্তাব রাখেন। তারপর তৎকালীন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ আসনের সংসদ সদস্য এডভোকেট আবদুল লতিফ এই বালুচর স্থানটিকে এমপি টিলা নামে বাস্তবায়ন করেন। ঈদ ছাড়াও বিভিন্ন ছুটিতে প্রতি বছর এখানে অসংখ্য পর্যটক বেড়াতে আসে।

এছাড়াও নবীনগর উপজেলার দর্শনীয় স্থানের মাঝে ব্যাপক পরিচিত রয়েছে-

  • রসুলপুর হাওর
  • আহাম্মদপুর মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতিসৌধ
  • সলিমগঞ্জ কলেজ
  • শ্রীঘর মঠ
  • শাহ্ সুফি হযরত মাওলানা মো: ইলিয়াছ শাহ্ (র:) এর দরবার শরীফ।
  • বাড়িখোলা তঞ্জু মৌলভির মাজার
  • গনিশাহ মাজার শরীফ
  • খাতাবাড়িয়ার রহমানিয়া দরবার শরীফ
  • কৈবর্তবাড়ী ও মিস্ত্তর বাড়ীর মঠ
  • হযরত পীর সৈয়দ দয়াল বাবা ফিরোজ শাহ্ (রঃ) এর মাজার
  • দয়াময় মন্দির
  • রছুল্লাবাদ খান বাড়ির দিঘিরপার
  • নাটঘর শিবমন্দির
  • মহর্ষি মনোমোহন দত্ত আশ্রম